কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
ঢোলের তালে তালে লাঠির ঝনঝন শব্দ। মুহূর্তেই একের পর এক কসরত, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ আর লাঠিয়ালদের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে জমে উঠল আসর। কখনো লাঠি ঘুরছে শূন্যে, কখনো বিদ্যুৎগতিতে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে দিচ্ছেন খেলোয়াড়রা। মাঠজুড়ে তখন টানটান উত্তেজনা, আর চারপাশে দর্শকদের উচ্ছ্বাস।
হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার সেই চেনা দৃশ্যই যেন ফিরে এসেছিল কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার ঝাউদিয়া আস্থানগরে। সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা। বিকেল গড়াতেই খেলার মাঠ ঘিরে জড়ো হতে থাকেন নানা বয়সী মানুষ। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ—সব বয়সের দর্শকের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
লাঠিয়ালদের হাতে বাঁশের লাঠি যেন মুহূর্তেই রূপ নেয় শিল্পের অনুষঙ্গে। ঢোলের ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কখনো একক, কখনো দলবদ্ধ কসরতে মাতিয়ে রাখেন দর্শকদের। দ্রুত পায়ের চাল, শূন্যে লাফ, নিখুঁত আত্মরক্ষা এবং মুহূর্তের মধ্যে আক্রমণ—সব মিলিয়ে লাঠিখেলার প্রতিটি পর্বেই ছিল রোমাঞ্চের আবহ।
দর্শকদের উচ্ছ্বাসও ছিল চোখে পড়ার মতো। লাঠির প্রতিটি চমকপ্রদ কসরতে চারদিক থেকে ভেসে আসে হাততালি ও উল্লাস। অনেক প্রবীণের কাছে এই আয়োজন ছিল হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার মতো। আর নতুন প্রজন্মের কাছে লাঠিখেলা হয়ে ওঠে বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা এক বিস্ময়কর লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।
একসময় গ্রামবাংলার মেলা, উৎসব ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে লাঠিখেলার আসর ছিল প্রায় অবধারিত। ঢোলের বাদ্য, লাঠিয়ালদের কসরত আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠত গ্রামের মাঠ। কিন্তু আধুনিক বিনোদনের বিস্তার, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্য এখন অনেকটাই ম্লান। কোথাও কোথাও লাঠিখেলার আয়োজন হলেও তা আগের মতো নিয়মিত নয়।
স্থানীয়দের মতে, লাঠিখেলা নিছক বিনোদন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার লোকসংস্কৃতি, আত্মরক্ষার কৌশল, শারীরিক সক্ষমতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির ইতিহাস। এটি একই সঙ্গে ক্রীড়া, কসরত ও লোকশিল্পের এক অনন্য সমন্বয়। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে নিয়মিত আয়োজন ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
লাঠিয়ালদের রঙিন পোশাক, ঢোলের তালে ছন্দময় পদক্ষেপ আর নিখুঁত কসরত পুরো আয়োজনকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। খেলোয়াড়দের শারীরিক দক্ষতার পাশাপাশি প্রতিটি মুহূর্তে ফুটে উঠেছে বহু প্রজন্মের চর্চায় গড়ে ওঠা লোকজ কৌশলের সৌন্দর্য।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, নিয়মিতভাবে এ ধরনের লোকজ আয়োজন করা হলে হারিয়ে যেতে বসা লাঠিখেলা আবারও মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তৈরি হবে দেশীয় সংস্কৃতি ও শেকড়ের প্রতি আগ্রহ।
ঝাউদিয়া আস্থানগরের লাঠিখেলার আসর তাই শুধু একটি দিনের বিনোদন ছিল না। এটি ছিল অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন। আধুনিকতার ব্যস্ত সময়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও সেখানে ফিরে এসেছিল গ্রামবাংলার সেই চিরচেনা আবহ—ঢোলের বাদ্য, লাঠির ঝনঝন শব্দ আর মানুষের মিলনমেলায়, যেখানে খেলায় মিশে ছিল ঐতিহ্য, স্মৃতি ও শেকড়ের টান।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |