| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

কুষ্টিয়ার খাজানগর খালে ছাইয়ের আস্তর

রিপোর্টারের নামঃ MD MUNZURUL ISLAM
  • আপডেট টাইম : 19-06-2026 ইং
  • 10576 বার পঠিত
কুষ্টিয়ার খাজানগর খালে ছাইয়ের আস্তর
ছবির ক্যাপশন: অটো রাইস মিলের গরম পানি ও বর্জ্যে বিপর্যস্ত পরিবেশ, হুমকিতে কৃষি ও জনজীবন

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম

এক সময়ের স্বচ্ছ, টলমলে পানির খাল। সেই পানিতেই সেচ দিয়ে সবুজে ভরে উঠত মাঠের পর মাঠ। কৃষকের মুখে ফুটত হাসি, খালে চলত মাছ ধরা, শিশুদের জলকেলি আর গবাদিপশুর গোসল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই প্রাণের খাল আজ যেন বিষের নালায় পরিণত হয়েছে। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাজানগর এলাকায় গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের শাখা ও উপশাখা খাল এখন অটো রাইস মিলের গরম পানি, ছাই ও শিল্পবর্জ্যে ঢেকে গেছে। ফলে পরিবেশ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্য—সবই পড়েছে চরম হুমকির মুখে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, খাজানগর ও পার্শ্ববর্তী মিরপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক অটো রাইস মিল প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গরম পানি ও ছাই সরাসরি জিকে খালে ফেলছে। এতে খালের পানি কালো হয়ে গেছে, সৃষ্টি হয়েছে দুর্গন্ধ, কোথাও কোথাও ছাই জমে পানি প্রবাহও বন্ধ হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রভাতি রাইস মিলের সামনে থেকে শুরু হওয়া জিকে প্রকল্পের দুটি খাল দূষিত পানিতে প্রায় অস্তিত্ব সংকটে। খালের বুকে জমে থাকা ছাই ও বর্জ্যের স্তর যেন প্রকৃতির অসহায়ত্বের এক নির্মম চিত্র। খালের দুই পাড়জুড়ে বসবাসকারী মানুষ এখন সেই পানি স্পর্শ করতেও ভয় পান।

স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, "এক সময় এই খালে মাছ ধরা হতো, মানুষ গোসল করত। এখন ছাই আর বিষাক্ত পানিতে খালটাই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। দুর্গন্ধে কাছেও দাঁড়ানো যায় না।"

এক গৃহিণী জানান, আগে গরু-ছাগলকে খালে গোসল করানো হতো। এখন ওই পানিতে নামলেই শরীরে চুলকানি দেখা দেয়। পানির রং কালো হয়ে গেছে, আর ছাই জমে অনেক স্থানে পানি চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে।

খালের আশপাশে অবস্থিত প্রভাতি রাইস মিল, হযরত আলী অটো রাইস মিল, প্রগতি রাইস মিল, নূর অটো রাইস মিল, মিয়া ভাই অটো রাইস মিল, দাদা রাইস মিল ও সততা রাইস মিলসহ অন্তত এক ডজন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি অটো রাইস মিলে বয়লারের গরম পানি সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট জলাধার এবং ছাই নিয়ন্ত্রণে আধুনিক যন্ত্র স্থাপনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই এসব নিয়ম মানছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। বছরের পর বছর জিকে খালের পানি ব্যবহার করে স্বল্প ব্যয়ে ধানসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করলেও গত কয়েক বছরে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।

কৃষক আশরাফুল হক ও সিরাজুল ইসলাম জানান, আগে মাত্র ২০০ টাকায় বিঘাপ্রতি সেচ দেওয়া যেত। এখন দূষিত পানির কারণে ফসলের গোড়া পচে যায়, রোগবালাই বাড়ে এবং উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে সেচ দিতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন খরচও অনেক বেড়ে গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মিয়া অটো রাইস মিলের মালিক জয়নাল আবেদিন প্রধান বলেন, খাজানগরে দীর্ঘদিন ধরে রাইস মিল গড়ে উঠেছে। এখন এসব মিল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই কেবল মিল মালিকদের দায়ী না করে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

এদিকে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রশিদুর রহমান জানান, দূষণকারী মিলগুলোর তালিকা তৈরি করে ইতোমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকেও জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এমদাদুল হক বলেন, কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে। আইন অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।

পরিবেশবিদদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে শুধু জিকে খালের অস্তিত্বই নয়, আশপাশের কৃষিজমি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যও ভয়াবহ সংকটে পড়বে। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, নিয়মিত তদারকি বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগে কঠোরতা এখন সময়ের দাবি।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের এই লড়াইয়ে প্রশ্ন একটাই—উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংসের এই মূল্য আর কতদিন দেবে খাজানগরের মানুষ?

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ আলোর পথ | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় অনুপম