কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
কুষ্টিয়া সদর, দৌলতপুর, ভেড়ামারা, মিরপুর, কুমারখালী ও খোকসা উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, রাস্তার দুই ধারে এবং পতিত ভূমিতে দ্রুত বিস্তার ঘটছে বিষাক্ত আগাছা পার্থেনিয়াম। দেখতে অনেকটা ধনিয়া গাছের মতো নিরীহ মনে হলেও ‘কংগ্রেস ঘাস’ বা ‘গাজর ঘাস’ নামে পরিচিত এই আক্রমণাত্মক আগাছা কৃষি, পরিবেশ, গবাদিপশু এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। কৃষিবিদদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে জেলার কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত চার থেকে পাঁচ বছরে দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকায় পার্থেনিয়ামের বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা, রাস্তার ধারে, পতিত জমি এবং ফসলি মাঠের আইলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও অধিকাংশ মানুষ এখনো এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। ছোট ছোট সাদা ফুলে আচ্ছাদিত আগাছাটি ইতোমধ্যেই কৃষকদের নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার উৎপত্তি হওয়া এই আগাছা ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করা হয়। মাত্র তিন থেকে চার মাসের জীবনচক্রে একটি পার্থেনিয়াম গাছ হাজার হাজার বীজ উৎপাদন করতে পারে। বাতাস, যানবাহন, পশুপাখি এবং মানুষের চলাচলের মাধ্যমে এসব বীজ দ্রুত নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে দীর্ঘ সময় পানিতে নিমজ্জিত বা ঘন ছায়াযুক্ত স্থানে সাধারণত এর বৃদ্ধি কম হয়।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কয়েক বছর আগেও এ আগাছার উপস্থিতি ছিল সীমিত। বর্তমানে কৃষিজমির চারপাশে ব্যাপক বিস্তারের কারণে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় গবাদিপশুর খাদ্যের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। মাঠে কাজ করতে গিয়ে অনেক কৃষক ত্বকে চুলকানি, অ্যালার্জি ও বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
মথুরাপুর ইউনিয়নের হোসেনাবাদ গ্রামের কৃষক ওবাইদুল হোসেন বলেন, “আগে এই গাছ খুব একটা দেখা যেত না। এখন জমির চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। শরীরে বা ঘামযুক্ত ত্বকে লাগলেই চুলকানি শুরু হয়। কেটে ফেললেও আবার দ্রুত গজিয়ে ওঠে।”
একই এলাকার কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, “জমির চারপাশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। গরু-ছাগলও মাঝে মাঝে খেয়ে ফেলছে। কোনো কীটনাশকেও তেমন কাজ হচ্ছে না। দ্রুত এটি দমন করা জরুরি।”
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, “পার্থেনিয়ামের সংস্পর্শে এলে অ্যালার্জি, চুলকানি, চর্মরোগ, চোখে জ্বালাপোড়া এবং শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর পাতা, ফুল ও পরাগরেণু মানুষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই মাঠে কাজের সময় গ্লাভস, মাস্ক ও অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করা উচিত।”
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব জানান, পার্থেনিয়াম গবাদিপশুর জন্যও অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি খেলে হজমের সমস্যা, জ্বর, দুর্বলতা এবং বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে দুগ্ধবতী গাভির ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব আরও বেশি।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক আহসান কবির রানা বলেন, “পার্থেনিয়ামের পাতা, ফুল ও বীজ—সবই বিষাক্ত। এর পরাগরেণু বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই ফুল ফোটার আগেই গাছ শিকড়সহ উপড়ে নিরাপদে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। এ আগাছা নিয়ন্ত্রণে সরকার, কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।”
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি অফিসের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ফারিহা তানজুম স্বর্ণা বলেন, “পার্থেনিয়াম মাটির পুষ্টি উপাদান ও আর্দ্রতা দ্রুত শোষণ করে আশপাশের ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এর কারণে ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে। কৃষি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে পার্থেনিয়ামকে বিষাক্ত আগাছা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে এটি দমনের জন্য এখনো কার্যকর কোনো নির্দিষ্ট কীটনাশক বাজারে নেই।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্থেনিয়াম নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ফুল ও বীজ আসার আগেই গাছ শিকড়সহ উপড়ে নিরাপদে ধ্বংস করা। আগাছা অপসারণের সময় অবশ্যই গ্লাভস, মাস্ক ও সুরক্ষামূলক পোশাক ব্যবহার করতে হবে। উপড়ে ফেলা গাছ মাটির নিচে পুঁতে ফেলা অথবা নিরাপদ উপায়ে ধ্বংস করতে হবে, যাতে বীজ ছড়িয়ে নতুন করে বিস্তার ঘটাতে না পারে।
কৃষিবিদদের মতে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত নজরদারি এবং কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই বিষাক্ত আগাছার বিস্তার রোধ করতে। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পার্থেনিয়াম শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও এক দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |