কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
বর্ষার স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, তুলনামূলক কম সেচ খরচ এবং ভালো ফলনের প্রত্যাশা—এই তিন কারণে কুষ্টিয়ায় দিন দিন বাড়ছে আমন ধান চাষে কৃষকদের আগ্রহ। জেলার ছয় উপজেলাজুড়ে এ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আমনের আবাদ হয়েছে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন দুলছে সবুজ ধানের সমারোহ, কোথাও কোথাও ধান গাছে ফুটতে শুরু করেছে সোনালি শিষ। নতুন ধানের আগমনী বার্তায় গ্রামবাংলায় ফিরেছে নবান্নের আবহ। তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় স্বস্তির পাশাপাশি কৃষকদের কপালে দেখা দিয়েছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়ায় চলতি মৌসুমে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে। ইতোমধ্যে সদর, মিরপুর, দৌলতপুর, কুমারখালী, খোকসা ও ভেড়ামারা—জেলার ছয়টি উপজেলাতেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে আমনের আবাদ হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বশেষ বোরো মৌসুমে জেলায় ৩৫ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে বলে কৃষি বিভাগের তথ্য জানায়।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কৃষকেরা এখন প্রচলিত জাতের পাশাপাশি উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান চাষে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। এর মধ্যে ব্রি ধান-৭১, ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৯০, ব্রি ধান-৯৫, বিনা-১৭ এবং হাইব্রিড জাতের হিরা ও ধানি গোল্ড উল্লেখযোগ্য। এসব জাত কম সময়ে পরিপক্ব হওয়ায় একই জমিতে পরবর্তী মৌসুমে আলু, সরিষা, গমসহ বিভিন্ন রবিশস্য চাষের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে জমির ব্যবহার বাড়ছে, পাশাপাশি কৃষকের আয় বৃদ্ধিরও সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
দৌলতপুর উপজেলার কৃষক জিনারুল ইসলাম বলেন,"এবার ধানের ফলন খুবই ভালো হয়েছে। প্রতি বিঘায় ১৭ থেকে ২০ মণ, কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি ধান পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সার, কীটনাশক, ডিজেল ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। প্রতি বিঘায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। তাই কৃষকের লাভ নিশ্চিত করতে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।"
জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এবার সেচের প্রয়োজন তুলনামূলক কম হয়েছে। এতে ডিজেল ও বিদ্যুতের ব্যয় কমলেও কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি সেই সুবিধার অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। বিশেষ করে বীজ, সার, কীটনাশক ও কৃষিশ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অনেক কৃষক সময়মতো সার পাওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে নতুন ধান ঘরে উঠতে শুরু করায় গ্রামাঞ্চলে ফিরেছে চিরচেনা নবান্নের আমেজ। উঠোনে শুকানো হচ্ছে নতুন ধান, ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে পিঠা-পুলি। নতুন চালের সুবাসে মুখর হয়ে উঠেছে গ্রামীণ জনপদ। শিশু-কিশোরদের আনন্দ আর কৃষকের ব্যস্ততায় যেন আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী কৃষিজীবন।
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, "কৃষকদের উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আয় বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।"
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. হায়াত মাহমুদ বলেন, "কুষ্টিয়ার মাটি ও আবহাওয়া আমন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। উন্নত জাতের ধান চাষ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি সহায়তার কারণে প্রতিবছর উৎপাদন বাড়ছে। কৃষকেরা যাতে আরও লাভবান হন, সে জন্য মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।"
কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের লাভ নিশ্চিত করতে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষি উপকরণের দাম সহনীয় রাখা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আমন ধানের আবাদ আরও সম্প্রসারিত হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হবে আরও শক্তিশালী। কারণ, কৃষকের হাসিই দেশের খাদ্যভাণ্ডারের সবচেয়ে বড় শক্তি।
| ফজর | ৫.২১ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৩.৪৭ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৫.২৬ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৬.৪৪ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১২.৩০ মিনিট দুপুর |